আদনান মুরাদ
হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তি উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ও বাণিজ্যনির্ভর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে পরিচিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানকার মানুষের চাওয়া-পাওয়া বদলেছে। এখন তারা শুধু ছোটখাটো উন্নয়ন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা দেখতে চায়।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নারীদের নিরাপত্তা—এই চারটি বিষয় এখন হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তির মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
চাকরি ও কর্মসংস্থান: সবচেয়ে বড় সংকট
স্থানীয়দের মতে, হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তিতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষিত হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে অনেক যুবককে বেকার থাকতে হচ্ছে অথবা বিদেশে পাড়ি জমাতে হচ্ছে। স্থানীয় মানুষদের চাওয়া, হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তি ইকোনমিক জোন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, নারী-বান্ধব কারখানা।
শাহরাস্তির কলেজশিক্ষার্থী সালমান রহমান বলেন, “আমরা চাই এলাকায় এমন শিল্প বা কারখানা হোক, যাতে পড়াশোনা শেষ করেই কাজ পাওয়া যায়।” এ কারণে এলাকাবাসী ইকোনমিক জোন, শিল্পপার্ক ও কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের দাবি জানাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসেবা: নারী ও শিশুদের দুশ্চিন্তা
এলাকায় বড় ও আধুনিক হাসপাতালের অভাব দীর্ঘদিনের। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে এখনো মানুষকে কুমিল্লা, ঢাকা বা জেলা শহরে যেতে হয়। হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার গৃহবধূ মুক্তা বেগম বলেন, “ডেলিভারি বা জরুরি অসুস্থতায় হাসপাতালে যেতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। এখানে একটি বড় হাসপাতাল খুব দরকার।” বিশেষ করে নারীরা চান— মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল, ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসা, সহজ ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা।
যোগাযোগ ও জলাবদ্ধতা: নিত্যদিনের ভোগান্তি
হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তির বেশ কিছু এলাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। শাহরাস্তি উয়ারুক বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানান, “রাস্তা খারাপ হলে ব্যবসা টেকে না। পণ্য আনা–নেওয়ায় সমস্যা হয়।” এ কারণে মানুষ চাইছে— উন্নত ও প্রশস্ত সড়ক, স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপদ সেতু ও কালভার্ট। বিশেষ করে, “দোয়াভাঁঙ্গা-শাহরাস্তি-পানিওয়ালা (রামগঞ্জ)” মহাসড়ক উন্নয়নের মতো প্রকল্পগুলো উপজেলা-মহাসড়ককে শক্ত করবে।
এছাড়াও হাজীগঞ্জ বাজারের যানজট নিরসন জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি। হাজীগঞ্জের ব্যবসায়ী হাসান সর্দার বলেন, বাজারের যানজট নিরসনে বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণ করতে হবে।
নারী ও যুব উন্নয়ন: ভবিষ্যতের দাবি
নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা শুধু ভাতা নয়, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা চান। নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার দাবি উঠছে জোরালোভাবে।
হাজীগঞ্জের জনৈক নারী উদ্যোক্তা বলেন, “সুযোগ পেলে আমরা নিজেরাই দাঁড়াতে পারি। শুধু একটু সহায়তা দরকার।”
সুশাসন ও জবাবদিহিতা
এলাকাবাসীর আরেকটি বড় চাওয়া হলো—দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। তারা চান এমন জনপ্রতিনিধি, যিনি নিয়মিত এলাকায় থাকবেন, মানুষের কথা শুনবেন এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করবেন।
প্রবীণ ভোটার মাকসুদুর রহমান বলেন, “আমরা এমপি চাই কাজের মানুষ, কথা দিয়ে কথা রাখে এমন মানুষ।”
সার্বিকভাবে হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তির মানুষ এখন ভবিষ্যতমুখী উন্নয়ন চায়। তাদের প্রত্যাশা—চাকরি ও শিল্পায়ন, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা।
এলাকাবাসীর মতে, এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে হাজীগঞ্জ–শাহরাস্তি শুধু চাঁদপুর নয়, পুরো অঞ্চলের একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
