
আদনান মুরাদ
চাঁদপুর জেলায় ২০২৬ সালের এইচএসসি (সাধারণ), আলিম ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ফলাফলে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। তিন ধারার পরীক্ষায় মোট ১৬৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এর মধ্যে এইচএসসি (সাধারণ) পরীক্ষায় ১০৭ জন, আলিমে ৪৫ জন এবং এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ১৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
তবে পাসের হারে তিন ধারার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে এইচএসসি (সাধারণ)। এ পরীক্ষায় জেলার পাসের হার মাত্র ৪৫.৩৫ শতাংশ। আলিমে ৬৪.২৭ শতাংশ এবং ভোকেশনালে ৬৯.৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত উপজেলাভিত্তিক ফলাফল বিবরণী বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এইচএসসি (সাধারণ) পরীক্ষায় জেলার ৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার ২৭৩ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ হাজার ১৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৭ জন। আলিম পরীক্ষায় ৯৭টি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৫৭২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৫ জন। অন্যদিকে, এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ৯৭২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৮০ জন উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ১৭ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
এইচএসসি সাধারণে পাসের হার ৪৫.৩৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৭ জন
এইচএসসি (সাধারণ) পরীক্ষায় চাঁদপুর জেলার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, আটটি উপজেলার মধ্যে কোনো উপজেলাতেই পাসের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছায়নি। পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে চাঁদপুর সদর উপজেলা। অন্যদিকে, সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে মতলব উত্তর।
চাঁদপুর সদর উপজেলায় ১৪টি প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার ৬২৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ১৩৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে সর্বোচ্চ ৭৩ জন। পাসের হার ৫৮.৯০ শতাংশ।
শাহরাস্তি উপজেলায় ৬টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৭০ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন। পাসের হার ৪৪.৮৮ শতাংশ।
হাজীগঞ্জ উপজেলায় ৯টি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৭১৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২০৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ জন। পাসের হার ৪৪.৩৪ শতাংশ।
কচুয়া উপজেলায় ৯টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৫৭৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩০ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ জন। পাসের হার ৪০.০৩ শতাংশ।
মতলব উত্তর উপজেলায় ১২টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ১৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ২ জন। পাসের হার ৩১.৯১ শতাংশ, যা জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন।
মতলব দক্ষিণ উপজেলায় ৭টি প্রতিষ্ঠানের ৯২৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩২৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন। পাসের হার ৩৫.১৪ শতাংশ।
ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ৮টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৬৯২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭০৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ জন। পাসের হার ৪১.৯০ শতাংশ।
হাইমচর উপজেলায় ৪টি প্রতিষ্ঠানের ৪৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন। পাসের হার ৩২.৯৩ শতাংশ।
এইচএসসি সাধারণের ফলাফলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, জেলার মোট ১০৭ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৩ জনই চাঁদপুর সদর উপজেলার। অর্থাৎ মোট জিপিএ-৫-এর প্রায় ৬৮ শতাংশ এসেছে সদর উপজেলা থেকে। বিপরীতে মতলব উত্তর, শাহরাস্তি ও হাইমচরে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ২ জন করে।
আলিমে পাসের হার ৬৪.২৭ শতাংশ, জিপিএ-৫-এ যৌথভাবে এগিয়ে হাজীগঞ্জ-ফরিদগঞ্জ
আলিম পরীক্ষায় এইচএসসি সাধারণের তুলনায় ভালো ফলাফল করেছে চাঁদপুর জেলা। এ পরীক্ষায় ৯৭টি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৫৭২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৫ জন। জেলার গড় পাসের হার ৬৪.২৭ শতাংশ।
উপজেলাভিত্তিক ফলাফলে হাজীগঞ্জ উপজেলা পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে। এ উপজেলায় ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ৩৭৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩১০ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৮২.০১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ জন।
চাঁদপুর সদর উপজেলায় ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ৪১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩১৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন। পাসের হার ৭৬.১৪ শতাংশ।
শাহরাস্তি উপজেলায় ১০টি প্রতিষ্ঠানের ২৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৫৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন। পাসের হার ৫৭.৪৬ শতাংশ।
কচুয়া উপজেলায় ১৪টি প্রতিষ্ঠানের ৪৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ জন। পাসের হার ৬৪.১৩ শতাংশ।
মতলব উত্তর উপজেলায় ৬টি প্রতিষ্ঠানের ১৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এ উপজেলায় কেউ জিপিএ-৫ পায়নি। পাসের হার ৩৫.২২ শতাংশ।
মতলব দক্ষিণ উপজেলায় ৭টি প্রতিষ্ঠানের ১৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন। পাসের হার ৩১.৬২ শতাংশ। আলিম পরীক্ষায় এ উপজেলায় পাসের হার সবচেয়ে কম।
ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ২৭টি প্রতিষ্ঠানের ৬৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪১২ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ জন। পাসের হার ৬১.৯৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে হাজীগঞ্জের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে ফরিদগঞ্জ।
হাইমচর উপজেলায় ৩টি প্রতিষ্ঠানের ৯১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৭৩.৬৩ শতাংশ। এ উপজেলায় কেউ জিপিএ-৫ পায়নি।
আলিম পরীক্ষার ফলাফলে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জ উপজেলা। পাসের হারে হাজীগঞ্জ প্রথম হলেও জিপিএ-৫ অর্জনে দুই উপজেলা সমান অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার ফলাফল তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
ভোকেশনালে পাসের হার ৬৯.৯৬ শতাংশ, শাহরাস্তিতে শতভাগ পাস
এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় চাঁদপুর জেলার পাসের হার ৬৯.৯৬ শতাংশ। এ পরীক্ষায় ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ৯৭২ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। প্রকাশিত ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৮০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ জন।
উপজেলাভিত্তিক ফলাফলে শাহরাস্তি উপজেলায় শতভাগ পাসের সাফল্য এসেছে। এ উপজেলার একটি প্রতিষ্ঠানের ৪৪ জন পরীক্ষার্থীর সবাই উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে কেউ জিপিএ-৫ পায়নি।
ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ২টি প্রতিষ্ঠানের ৭৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৮৫.৫৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন।
হাজীগঞ্জ উপজেলায় ৫টি প্রতিষ্ঠানের ৫৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪১২ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৭৬.২৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে সর্বোচ্চ ১১ জন।
হাইমচর উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানের ৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৭০.৪৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন।
মতলব দক্ষিণ উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানের ৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৫৯.১৫ শতাংশ।
চাঁদপুর সদর উপজেলায় ২টি প্রতিষ্ঠানের ১৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৪০.৫৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, কচুয়া উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানের ৬ জন পরীক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে পাসের হার শূন্য শতাংশ। মতলব উত্তর উপজেলায় এ পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেনি।
তিন ধারায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬৯ জন, এগিয়ে চাঁদপুর সদর ও হাজীগঞ্জ
তিন ধারার পরীক্ষার জিপিএ-৫ প্রাপ্তির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১৬৯ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছে। এর মধ্যে এইচএসসি সাধারণে ১০৭ জন, আলিমে ৪৫ জন এবং ভোকেশনালে ১৭ জন।
এইচএসসি সাধারণে ৭৩ জন জিপিএ-৫ নিয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা শীর্ষে। আলিমে হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জে ১৬ জন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভোকেশনালে ১১ জন জিপিএ-৫ নিয়ে শীর্ষে হাজীগঞ্জ।
অর্থাৎ তিন ধারার পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনে চাঁদপুর সদর, হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো করেছে। বিশেষ করে হাজীগঞ্জ তিন ধারার ফলাফলে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।
ফলাফলে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন
তিন ধারার ফলাফল পাশাপাশি রাখলে চাঁদপুর জেলার শিক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। এইচএসসি সাধারণে পাসের হার ৪৫.৩৫ শতাংশ হলেও আলিমে ৬৪.২৭ এবং ভোকেশনালে ৬৯.৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারায় পাসের হার বেশি।
বিশেষ করে এইচএসসি সাধারণে জেলার আট উপজেলার কোনোটিতেই পাসের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছায়নি। মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ ও হাইমচরে পাসের হার ৩৬ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে, আলিমে মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণের ফলাফলও দুর্বল। ফলে কয়েকটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে শুধু পাসের হার দিয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার মান নির্ধারণ করা যায় না। পরীক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী প্রস্তুতি, শিক্ষকদের পাঠদান, প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষার এই বৈষম্য কমাতে পিছিয়ে থাকা উপজেলাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি, নিয়মিত পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
চাঁদপুর জেলার এবারের এইচএসসি, আলিম ও ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলাফল একদিকে যেমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তুলে ধরেছে, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষায় পাসের নিম্নহার এবং উপজেলাভিত্তিক ফলাফলের বৈষম্য জেলার শিক্ষা প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


















