
স্টাফ রিপোর্টার
শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে যে মেয়ের ঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জীবন কাটানোর কথাা। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছা আর প্রতিবন্ধী সংগঠন ‘বিপিকেএস’-এর সাহচর্য তাকে বিশ্বমঞ্চে বিজয়ের পর কর্মজীবনে শিক্ষক হিসেবে জাতীয় শিক্ষক সম্মাননার মঞ্চে নিয়ে গেছে।
তিনি আর কেউ নন, ফরিদগঞ্জ উপজেলার হাফছা আক্তার। ক্রীড়া ও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতা অর্জনের পর বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতীয়ভাবে নির্বাচিত গুণী শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষ গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষক হাফছা আক্তার। সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এই সম্মাননাপত্র গ্রহণ করেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত শিক্ষকদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র দেয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি ইতোমধ্যে ৯৫ জন গুণী শিক্ষককে চূড়ান্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে হাফছা আক্তার একজন।
হাফছা আক্তারের এই দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)-এর। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত স্ব-সংগঠন ‘চাঁদপুর ডিজএ্যাবল্ড পিপলস্ অর্গানাইজেশন টু ডেভেলপমেন্ট’ (চাঁদপুর-ডিপিওডি), ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর তাঁর এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
হাফছা আক্তার ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোভান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দু ছেলের পর প্রথম মেয়ে হিসেবে তাঁর জন্মে পরিবারে নেমে এসেছিলো আনন্দের বন্যা। জন্মের পর প্রায় দু বছর স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু দু বছর বয়সে হঠাৎ জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন হাফছা। অসুস্থতার পর আর আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারেননি। ধীরে ধীরে কোমরের নিচের অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও হাফসাকে বাড়ির পাশের শোভান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে প্রায়ই পড়ে যেতেন তিনি। তবুও থেমে থাকেননি। এভাবেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের প্রত্যাশী আর এ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন হাফছা।
তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চিন্তিত হলেও হাফছা তাঁর অধ্যবসায়, সাহস ও অদম্য মনোবলে খুব দ্রুত শিক্ষক ও সহপাঠীদের মনোভাব বদলে দেয়। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তখন থেকেই ছাত্র-ছাত্রী পড়ানো শুরু করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব ছিলো প্রায় ছয় কিলোমিটার।
২০০১ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ফরিদগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে। এবার বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই পথ কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো টেক্সি বা টেম্পুতে করে পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘ যাত্রার কষ্টও তাঁর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ২০০৫ সালে বিএসএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি।
২০০৫ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব হ্যান্ডি ম্যারাথনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৫১জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন হাফছা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে শক্তিতে পরিণত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকাকে তুলে ধরেন তিনি।
২০০৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন হাফছা আক্তার। কর্মস্থল ছিলো তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে, এরপর বাস কিংবা অন্য যানবাহনে করে কর্মস্থলে যেতে হতো তাঁকে।
এর পাশাপাশি তিনি নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করেছেন পরিবার সামলানোর পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন। একজন শিক্ষক, নারী উদ্যোক্তা ও পরিবারের অভিভাবক হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি।

















