চাঁদপুরের ১০ লাখ তরুণ ভোটারের চোখে দুর্ণীতিমুক্ত সৎ প্রার্থী
আদনান মুরাদ
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঁদপুর জেলার রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে এক নতুন বাস্তবতা—তরুণ ভোটারদের ভাবনায় বড় পরিবর্তন। দলীয় পরিচয়, প্রভাবশালী নাম কিংবা অতীতের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নয়; বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র, সততা ও দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে- ২০০৮ সালের পরে ভোটার হয়েছেন জেলার ৫টি আসনে এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যা ১০ লাখ ৯ হাজার ৫৭০জন। চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে ২০০৮ সালের পরে ভোটার হয়েছেন এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩৭ জন। যা মোট ভোটারের ৩৮.২৭%। চাঁদপুর-২(মতলব উত্তর-দক্ষিণ) আসনে ২০০৮ সালের পরে ভোটার হয়েছেন এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬২ জন। যা মোট ভোটারের ৪৫.৮৪%। চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনে ২০০৮ সালের পরে ভোটার হয়েছেন এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৫ জন। যা মোট ভোটারের ৪২.৯৭%। চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে ২০০৮ সালের পরে ভোটার হয়েছেন এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৪ জন। যা মোট ভোটারের ৪৪.১৯%। চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনে ২০০৮ সালের পরে ভোটার হয়েছেন এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৯২ জন। যা মোট ভোটারের ৪৩.৯৯%।
জেলার হাজীগঞ্জ, কচুয়া, ফরিদঞ্জ, হাইমচর ও চাঁদপুর সদরের তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে তারা বিরক্ত। তাদের মতে, একই ধাঁচের রাজনীতি আর দেখতে চান না তারা। এজন্যই এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দল নয়, প্রার্থীর নৈতিক অবস্থানকেই প্রাধান্য দিতে চান নতুন প্রজন্ম।
ফরিদগঞ্জের চান্দ্রা কলেজের শিক্ষার্থী শরীফ হোসাইন বলেন- আমরা আর গতানুগতিক রাজনীতি দেখতে চাইনা, আমরা চাই ভাই পলিটিক্স এর অবসান হোক, নেতাদের কাছে কর্মীরা নয় বরং কর্মীদের কাছে নেতারা আসুক।
বাবুরহাট এলাকার ভোটার চাঁদপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মুক্তা আক্তার বলেন- প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র, সততা ও দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিই দেখেই আমরা ভোট দিবো। আমরা চাই নারীরা নির্ভয়ে চলাচল করবে, কোন প্রকার বুলিং এর স্বীকার হবেনা।
হাইমচরের তরুণ ভোটার ইমরান হোসাইনের ভাষায়, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা দালান নয়। আমরা চাই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, কর্মসংস্থানের সুযোগ, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বাস্তব অগ্রগতি। এসব লক্ষ্য অর্জনে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্ব কখনো কার্যকর হতে পারে না—এই উপলব্ধি থেকেই আমরা সৎ ও স্বচ্ছ প্রার্থীকে ভোট দিব।
চাঁদপুর মিশন রোড এলাকার তরুণ ভোটার ইয়াছিন পাটোয়ারি বলেন- চাঁদাবাজী, দুর্ণীতি, স্বজনপ্রীতি থেকে যে প্রার্থী মুক্ত থাকবেন বলে মনে হবে এমন প্রার্থীকে ভোট দিব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রভাষক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, চাঁদপুর জেলার মোট ভোটারের একটি বড় অংশ এখন তরুণ। এই ভোটাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়, তথ্যভিত্তিক আলোচনা অনুসরণ করে এবং প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড ও জীবনযাপন খুঁটিয়ে দেখে। নির্বাচনের আগে তারা প্রার্থীর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং দুর্নীতির প্রশ্নে অবস্থান—সবকিছুই বিবেচনায় নিচ্ছে।
সহকারী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বরেন- রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই পরিবর্তন একটি বড় বার্তা। শুধু দলীয় শক্তি বা পুরোনো ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করে তরুণদের মন জয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বরং দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি, জনসম্পৃক্ততা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট ও বাস্তব পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারলেই তরুণ ভোটারদের আস্থা পাওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে চাঁদপুরে তরুণ ভোটারদের এই মনোভাব নির্বাচনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তারা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে—এই প্রজন্ম আর অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তাদের চোখে আদর্শ জনপ্রতিনিধি সেই ব্যক্তি, যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সৎ, সাহসী ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
