
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত অভ্যুত্থানে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চাঁদপুরেও পতন ঘটে স্বৈরাচারী সরকারের। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেদিন সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে এসে চাঁদপুর শহরকে মুক্ত ঘোষণা করেন।
দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে কারফিউ ভেঙে চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নেন।উত্তাল ৩ ও ৪ আগস্ট এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ:
মূল অভ্যুত্থানের ঠিক আগের দিনগুলোতেও উত্তাল ছিল চাঁদপুর। ৩ ও ৪ আগস্ট গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে চাঁদপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলে ইলিশ চত্বর, স্টেডিয়াম রোড, মিশন রোড, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক, হাজী মহসীন রোড ও আব্দুল করিম পাটওয়ারী সড়ক মুখরিত হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ছিল জ্বালাময়ী স্লোগান— ‘দিনে করে নাটক, রাতে করে আটক’, ‘আমার খাও, আমার পর, আমাকেই গুলি কর’, ‘তোমার কোটা তুমি নাও, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও’, ‘দিয়েছিতো রক্ত আরো দেব রক্ত’ ইত্যাদি। এ সময় মেয়েদের হাতে রুটি বানানো বেলুন, ডালঘুটনি, খুন্তি ও গুলাই দেখা যায়। তৎকালীন সময়ে আন্দোলন দমাতে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় থাকলেও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যান।
তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. ইয়াসির আরাফাত জানিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে পুলিশের সহায়তা ছিল বলেই তারা শান্তিপূর্ণভাবে তা সম্পন্ন করতে পেরেছিল। তবে এর মধ্যেও কিছু জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নারীদের লেকের পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনার নজিরও রয়েছে।
৫ আগস্ট: বিজয়ের উল্লাস ও জনস্রোত:
৫ আগস্ট সকাল থেকেই চাঁদপুরের বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে সাধারণ মানুষ জড়ো হতে শুরু করে। দুপুরের পর প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগের চূড়ান্ত খবর নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই চাঁদপুরের রাজপথে আনন্দের জোয়ার বয়। শিশু, বৃদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সবাই নেমে আসেন রাস্তায়।
চাঁদপুর শহরের ডিসি অফিস সামনের সড়ক থেকে বাসস্ট্যান্ড ফয়সাল শপিং কমপ্লেক্স, ইলিশ চত্বর, স্টেডিয়াম রোড, মিশন রোড, মুক্তিযোদ্ধা সড়ক এবং শহরের প্রাণকেন্দ্র বাইতুল আমিন রেলওয়ে জামে মসজিদ চত্বর পরিণত হয় বিজয়ের হটস্পটে।
বিশেষ করে বাইতুল আমিন রেলওয়ে জামে মসজিদ চত্বরে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলের নেতাকর্মীসহ আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা সমবেত হয়ে বিজয় উল্লাস করেন। সেখানে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চাঁদপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক একেএম সলিম উল্যা সেলিমসহ অন্যান্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
একদিকে ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও মর্মান্তিক স্মৃতির দিন, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয়ের দিন হিসেবে ৫ আগস্ট চাঁদপুরের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


















