স্বাগত বাংলা নব্বর্ষ ১৪ ৩২। সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুরের শহর থেকে গ্রামের মানুষ মেতে উঠেছে বৈশাখ উদযাপনে।
কবিগুরুর কথায় ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা, প্রকৃতির নিয়মে দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এলো, বাংলা সন ১৪০১৩। বসন্ত শেষে প্রকৃতিতে ছোঁয়া লেগেছে গ্রীষ্মের। রোদের তাপদাহে কিছুটা অতিষ্ঠ মানুষ। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে আরো একটি বছর।
রাত পোহালেই নতুন বাংলা বছর ১৪৩২ বাংলা নতুন সনকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সবাই। কারন একটাই- পহেলা বৈশাখ, বাঙালির অন্যতম প্রাণের উৎসব। মানুষ ভালো থাকুক আর মন্দ থাকুক নববর্ষের তাদের ভালো কাটুক এটাই প্রত্যাশা সবার।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জেলাবাসী সর্বত্র আজ ১৪ এপ্রিল সোমবার ১৪৩২ বাংলা ১লা বৈশাখ উদ্যাপিত হবে মহা আনন্দে। ব্যতিক্রম দেখা যাবে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তারা নতুন বছরের ২ বৈশাখ মঙ্গলবার হালখাতা অনুষ্ঠান করবে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কীভাবে বরণ করবে পহেলা বৈশাখকে। তাই চারদিকে ব্যাপক তোড়জোর। নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। আজকের বাংলাদেশের জন্য কবির এ আহবানের চেয়ে আপন সুর আর কি হতে পারে! কঠিন বাস্তবতা, সমাজে করুণ-কঠোর বিভাজন।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের কর্মসুচি:- বাংলা ১লা বৈশাখ উদ্যাপনে জেলা প্রশাসন আয়োজনে চাঁদপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে(১২-৩০এপ্রিল) পযর্ন্ত লোকজ মেলার আয়োজন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সকাল ১০টায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতি সংগঠনের একত্রে শোভাযাত্রা ও উদ্বোধন পর্ব চাঁদপুর স্টেডিয়াম থেকে পুরো শহরব্যাপী। (১০-১৪ এপ্রিল) জেলা শিশু একাডেমীতে রচনা প্রতিযোগীতা ও চিত্রাংকন প্রতিযোগীতার অনুষ্ঠিত হয়েছে। চাঁদপুরে এই প্রথম বৈশাখ উপলক্ষে বিকেল ৩টায় ঘুড়ি উৎসব হবে চাঁদপুর ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ও চাঁদপুর প্রেসক্লাবের পিছনে, একই স্থানে বিকেল ৪টা থেকে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হবে সংগীত, নৃত্য, জারি গানসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সুবিধাজনক সময়ে হাসপাতাল, কারাগার, ও সরকারী শিশু পরিবাওে উন্নতমানের বাঙ্গালী খাবার পরিবেশন হবে। জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশে ও সাড়ন্বরে বাংলা নববর্ষ-১৪৩২ উদযাপন স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে হবে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এ বছর নববর্ষ উদ্যাপনে সকল ধরনের আনন্দ উৎসবসহ আয়োজন সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করার অনুরোধ জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন। গতকাল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৪৩১ বর্ষ বিদায় ও ১৪৩২ বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান। বিগত দিনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গ্রামে আজ ও ২ বৈশাখ শনিবার অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উদ্যাপিত হচ্ছে হালখাতা অনুষ্ঠান। কোন কোন বাংলা পঞ্জিকা মতে ১৪৩২ বাংলার সোমবারই হলো ১ বৈশাখ। সেই মতে অনেকেই এ দিনটি বাংলা শুভ নববর্ষ হিসেবে উদ্যাপন করে থাকবে।
১লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পান্তা ইলিশ খাওয়ার খুব রেওয়াজ থাকলেও গত কয়েক বছর সেই রেওয়াজ নেই। জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় বছরের এ সময় নদীতে মাছ ধরা (বিশেষ করে ইলিশ) নিষেধ থাকায় এখন আর শহরে ১লা বৈশাখের ইলিশ পান্তা খাওয়া হচ্ছে না। তারপরও কোন কোন ব্যবসায়ী ১লা বৈশাখকে সামনে রেখে বার্মার ইলিশ আমদানিসহ কিছু দেশী ইলিশ মজুদ রেখেছেন হয়তো আগামীকাল মহান আনন্দে ভেজন রসিকদের পান্তা ইলিশ উদ্যাপনের সুবিধার্থে। জানা যায়, কৃষি কাজের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হয়। আজ কাঙ্ক্ষিত সেই শুভ বাংলা নববর্ষ। এক ব্যবসায়ী জানালেন, ব্যবসার অবস্থা কিছুটা ভালো হচ্ছে এ বছর। সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষের মনে নববর্ষ নিয়ে তেমন কোনো ভাবনা নেই। তবুও কপালে যা জুটবে তা নিয়েই নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে সন্তুষ্ট থাকতে চান তারা।
সরজমিনে বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, অনেক ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ বাংলা নববর্ষ নিয়ে তেমন ভাবছে না। চিরাচরিত নিয়মে পহেলা বৈশাখের দিনটি কাটাতে চায় তারা। তবুও অনেক উৎসবপ্রিয় মানুষ এবং বিভিন্ন সংগঠন নববর্ষের বর্ণাঢ্য উচ্ছ্বাসময় উৎসবের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। দোকান/গদিঘর, মিল-ফ্যাক্টরী ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নিচ্ছে। অতীতের গ্লানি মুছে দিয়ে নতুন প্রভাতে নতুন বাংলা মনে আবার ফুটে উঠুক সকলের মুখে আনন্দের হাসি। এমনটা কামনা করে পুরাতন হিসাব চুকিয়ে শুভ হালখাতা করা নিয়ে ব্যস্ত সকল স্তরের ব্যবসায়ী সমাজ। মিষ্টি দোকানিরা ব্যস্ত জিলাপি, দই-মিষ্টি বানানোর কাজে। মাছ ব্যবসায়ীরা বছরের প্রথম দিনের জন্য রুই-কাতল, ইলিশসহ আঁশযুক্ত মাছ আগে ভাগে সংগ্রহ করে রাখছেন বিত্তবানদের কাছে বিক্রির জন্যে। খই-মুড়ির পাইকারি ও খুচরা বাজারও সরগরম। পোশাক ও কসমেটিকস এবং শাড়ি-লুঙ্গির দোকানগুলোর বেচা বিক্রি নববর্ষ উপলক্ষে বেড়েছে। শহরে বিভিন্ন মার্কেটে চলছে নববর্ষের কেনাকাটা। পহেলা বৈশাখে নারীর কাছে নতুন ডিজাইনের শাড়ি এবং পুরুষদের পছন্দ উৎসবের পাঞ্জাবি-পায়জামা ও ফতুয়া। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরও মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তারা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন মহাজনরা খুশি মনে তাদের শ্রমিক কর্মচারীদের পাঞ্জাবি-লুঙ্গি, গামছা এমনকি বউয়ের জন্য শাড়িও উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন। নববর্ষের দিনটিতে সবাই ভালো থাকতে চেষ্টা করেন। এই উৎসবকে ঘিরে পাড়া-মহল্লার ছেলে-মেয়েরা আনন্দে মেতে উঠে। বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলাও বসে। তবে ১লা বৈশাখে বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠে মিষ্টির দোকানীরা। এ সময় দেখা যায় শহরের ওয়ান মিনিট, ক্যাফে ঝীল, দুলাল সুইটস, মৌসুমী সুইটস, করুণা মিষ্টান্ন ভান্ডর, মুসলিম সুইটসসহ অন্যান্য মিষ্টির দোকানের কারিগররা ব্যস্ত দই-মিষ্টি ও কালাইর জিলাপি তৈরিতে। বছরের অন্যান্য সময় কালাইর জিলাপি না মিললেও ১লা বৈশাখ উপলক্ষে শহরের নামকরা মিষ্টির দোকানগুলোতে এ জিলাপী তৈরি হয়। তবে সাধারণ জিলাপীর চেয়ে এর দাম একটু বেশি হলো ক্রেতাদের খুব প্রিয় কালাইর জিলাপী।
