আদনান মুরাদ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন , যদি আপনাদের সৎপথে আয় করার উপায় না থাকে তাহলে আমাদেরকে বলিয়েন আমরা আমাদের জীবিকার অংশ থেকে আপনাদেরকে ভাগ দিব। যদি তানা করেন তাহলে ভিক্ষা করুন। কারণ চাঁদাবাজি করা হারাম, ভিক্ষা করা হারাম না।
শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) হাজীগঞ্জ পশ্চিম বাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চাঁদপুর জেলা শাখা কর্তৃক আয়োজিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চাঁদপুর জেলা নায়েবে আমীর এডভোকেট মাসুদুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং চাঁদপুর জেলা সেক্রেটারি এডভোকেট শাহজাহান মিয়ার পরিচালনায় আরও বক্তব্য রাখেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি এটিএম মাসুম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, চাঁদপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর আব্দুর রহিম পাটোয়ারী, শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি এডভোকেট আতিকুর রহমান প্রমুখ।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ধারণা করে নিয়েছিল তারা মনে হয় আজীবন এই দেশের শাসন ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু তারা চোরের মত পালিয়েছে। জমিনের মারিক আল্লাহ। কোথায় কাকে তিনি বসাবেন কাকে তিনি ক্ষসাবেন এই এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। চুরি, ডাকাতি, খুন, লুন্ঠন, চাঁদাবাজি নির্বিঘ্নে করার জন্যই তারা জামাত নেতাদের জেলে নিয়েছে, ফাঁসি দিয়েছে। কিন্তু তারা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে পারেনি।
দীপু মনি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর দীপু মনির সাথে একই কলেজে পড়াশুনা করত। তার কার্যক্রম দেখে আমার স্ত্রী লজ্জা পেতো। চাঁদপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই জমি কিনার নামে তারা লুটপাট করেছে।
বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বলেন, বিচারপতিরা আদালতে বসে ঘোষণা দিয়েছে আমরা শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ। এটা জাতির জন্য লজ্জার, ঘৃণার। সরকার বিচার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা দিনে জামায়াত নেতাদের ফাসির রায় দিতো, রাতে টকশোতে গিয়ে ঔদ্ধত্য দেখাতো।
আমীরে জামায়াত বলেন, ৫ আগস্ট এর আগে দুর্নীতি ছিল, চাঁদাবাজি ছিল। এখন কি নেই? একটা আঘাতে ৫ আগস্ট একটা গোষ্ঠী ভেঙ্গে চারখার হয়ে পালিয়ে গেছে। যারা লুটপাট চাঁদাবাজি করে তাদের জানা উচিত ৫ আগস্ট প্রত্যেক বছরই একবার আসে। জনগণ ৫ আগস্ট এর রাস্তা চিনে গেছে, এখন আর কেউ দুর্নীতি, লুটপাট করে ক্ষমতায় থাকতে পারবেনা।
তিনি তাদের বিনয়ের সাথে অনুরোধ করে বলেন, গোটা জাতি মজলুম ছিল, আপনারাও মজলুম ছিলেন । এমন কিছু করবেন না যা করলে শহীদদের আত্মা কষ্ট পায়, মজলুম মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম হয়।
আপনি যখন একটি পণ্যবাহী গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করেন তখন এর বোঝা গিয়ে পরে ১৮ কোটি মানুষের ঘাড়ে। একজন ভিক্ষা করা মানুষের উপর ও পরে, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর উপর ও পরে। জুলুম চাঁদাবাজি বন্ধ করেন। সাড়ে ১৫ বছর ঘরে বন্দি ছিলেন, ঘর থেকে বের হতে পারেন নাই। বর্তমান পরিস্থিতিকে আল্লাহ তাআলার নেয়ামত হিসেবে মনে করুন। আল্লাহ তাহলে আপনাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করে দেবে, দেশবাসী ও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন কোন পৌরসভা ওয়ার্ডে মেয়র, কাউন্সিলর নেই। একজন প্রশাসক দেয়া হয়েছে। তারা নির্বাচিত নন, তাই জনগণের কোন দায় তাদের উপর নেই। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা গুলো এখন অভিভাবক শূন্য, জনদুর্ভোগ নির্মূলের জন্য আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন হলেই জনগণের এই দুর্ভোগ কাটবে। তারপর অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনও দিতে হবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণ চায় মৌলিক কিছু সংস্কার।
তিনি বলেন, কোন কোন দলের নেতারা বলেন সংস্কার বড় কথা নয়, মানুষ কিভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচবে সেটা বড় কথা। আমি বলছি মানুষের খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্যই সংস্কার প্রয়োজন, নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশি শক্তি প্রদর্শন বন্ধের জন্যই সংস্কার প্রয়োজন, ১৮ বছরের উপরে প্রত্যেকে যাতে নিজের ভোট নিজে দিতে পারে তার জন্য সংস্কার প্রয়োজন, প্রবাসীরা যারা জুলাই বিপ্লবের অন্যতম কারিগর তাদের ভোটের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্যই সংস্কার প্রয়োজন।
এই সংস্কার গুলো করার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন ততটুকু সময়ের পরেই নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। গরিমসি করে সময় নষ্ট করা ও কাম্য নয়। আমরা জানি এক মাসের মধ্যে সংস্কার সম্ভব নয় তাই আমরা বলেছি যৌক্তিক সময় এর মধ্যেই নির্বাচন দিতে হবে।
আনুপাতিক নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, পেশি শক্তির প্রদর্শন বন্ধের জন্য আরেকটা মৌলিক দাবি আমরা প্রকাশ করেছি, সেটি হচ্ছে আমাদের ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচন। যেই দল যত পারসেন্ট ভোট পাবে সেই দল সংসদে ততটা আসন পাবে। এতে করে প্রত্যেক দলের মেধাবী নেতাদের আসন নিশ্চিত হবে।
অনেক ছোট দল আছে যাদের মধ্যে অনেক মেধাবী ও দেশপ্রেমিক নেতা আছে এতে করে তারাও সংসদে যেতে পারবে। কেউ ৪২ পার্সেন্ট ভোট পেয়ে নির্বাচিত হবেন আর কেউ ৪১% ভোট পেয়ে হেরে যাবেন। ওই হেরে যাওয়া লোকের ভোটাররা বলতে পারবে না যে আমার ভোট নষ্ট হয়েছে। পিআর নির্বাচন চালু হলে কোন গডফাদাররা নির্বাচনে আসবেনা। কারণ সে জানে না সে কত নম্বরে আছে।
আপনারা বলবেন তাহলে এলাকার উন্নয়ন কে দেখবে? এলাকার উন্নয়ন দেখবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এটা তাদের কাজ। এটা এমপিদের কাজ না। এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। দুনিয়ার সকল দেশে উন্নয়নের কাজ করে স্থানীয় সরকার। আর আমাদের দেশে তাদেরকে বঞ্চিত করে এটা নিয়ে নেয় এমপি এবং মন্ত্রীরা। এটা অন্যায় এটা সংবিধান বিরোধী।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সব জায়গায় সুষম উন্নয়ন চায়, একটা মানবিক বাংলাদেশ চায়। এর জন্য সবচেয়ে ভালো আদর্শ হচ্ছে ইসলাম। কারণ ইসলামী দলের নেতারা দুর্নীতি করে না, লুটপাট করে না, চাঁদাবাজি করে না। তারা আল্লাহকে ভয় পায়।
তিনি বলেন, আমরা কুরআন বুকে নিয়ে বাঁচতে চাই, কোরআন বুকে নিয়ে মরতেও চাই, কোরআন বুকে নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতে চাই। কোরআন থেকে এদেশের মানুষকে কেউই বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।
এ টি এম আজহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা জানেন পাঁচ আগস্ট ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বোঝা এখনো একজন মানুষের ঘাড় থেকে নামেনি, তিনি এটিএম আজহারুল ইসলাম। আমরা আশা করেছিলাম তার উপর যে জুলুম হয়েছে, রাষ্ট্র তাকে সম্মানিত করে মুক্তি দেবে। এখন পর্যন্ত তার মুক্তির ব্যবস্থা হয় নাই। এটা আমার দুর্বলতা। এই জন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ২৫ তারিখ তার মুক্তি না হলে আমিও আর মুক্ত বাতাসে থাকবো না। স্বেচ্ছায় কারাবরণ করব। আগামী ২৫ তারিখ সরকার যেন আমায় বন্দি করেন।
পথসভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, হাজীগঞ্জ শাহরাস্তি আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবুল হোসাইন, চাঁদপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, কচুয়া আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মুহাদ্দিস আবু নসর আশরাফী, চাঁদপুর শহর আমীর এডভোকেট শাহজাহান খান, শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের জেলা সভাপতি রহুল আমীন, হাজীগঞ্জ পৌরসভা আমীর আবুল হাসানাত পাটোয়ারী, হাজীগঞ্জ উপজেলা আমীর বিএম কলিমুল্লাহ, শাহরাস্তি উপজেলা আমীর মোস্তফা কামাল,কচুয়া উপজেলা আমীর এডভোকেট আবু তাহের মিসবাহ, ফরিদগঞ্জ উপজেলা আমীর ইউনুছ হেলাল, চাঁদপুর জেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ইব্রাহিম খলিল, চাঁদপুর শহর সভাপতি মোঃ মহররম আলী সহ জামায়াত এবং শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
