বৃহস্পতিবার , এপ্রিল ১৬ ২০২৬

চাঁদপুর-৩ আসনে বিএনপিতে একাধিক, জামায়াতের একক প্রার্থী

আদনান মুরাদ

চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনটি জেলা সদরের আসন হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারিত না হলেও প্রচার প্রচারণা ও কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহ উদ্দীপনায় সরগরম এ আসনের রাজনীতি।

বিএনপির আসনজুড়ে ভোটব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী বিতর্কিত আমল বাদ দিলে বরাবরই এ আসন ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য উর্বর। উর্বর এ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন পেতে প্রচার প্রচারণায় এগিয়ে আছে অন্তত ৩ বিএনপি নেতা।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পিছিয়ে নেই জামায়াতের প্রার্থীও। বেশ আগেভাগে মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ায় নির্বাচনী আসন চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী। ইসলামী আন্দোলন এবং গণফোরামের প্রার্থী সক্রিয় থাকলেও নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং গণঅধিকার পরিষদের কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই এই আসনে।

চাঁদপুরের গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী জিএম ফজলুল হক মাত্র ১৯ হাজার ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডাক্তার দীপু মনির সঙ্গে পরাজিত হয়েছিলেন। এরপর ২০১৪ থেকে ২০২৪ ভোটারবিহীন, একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডা. দীপু মনি এলাকায় একচেটিয়া রাজত্ব করেছেন।

জুলাই বিপ্লবের পর আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আজম খান ও বিএনপি নেতা মোস্তফা খান সফরীর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে জুলাই বিপ্লবের পর থেকে এ আসনে বেশকিছু বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বের অভিযোগ রয়েছে। তারপরেও এ আসনে তাদের অবস্থান মজবুত।

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে প্রচার ও সাংগঠনিক তৎপরতায় জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক অনেক এগিয়ে ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। সপ্তাহান্তে এ নির্বাচনী এলাকায় দলের নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন তিনি। গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের আমলে চাঁদপুর জেলায় বিএনপিকে সংগঠিত করে রেখেছেন শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তিনি জেল খেটেছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকে মিছিল মিটিং করেছেন, মিছিল করতে গিয়ে তিনি একাধিক মামলার আসামী হয়েছেন। শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ২০১৮ সালে চাঁদপুর-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। ভোটের দিন বেলা ১১টায় দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ২০১৮ সালে তিনি কাউন্সিলরদের ভোটে চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। জুলাই বিপ্লবের সময় তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে সরাসরি মঠে আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

চাঁদপুর-৩ আসনে বিএনপির অপর প্রার্থী মোঃ আজম খান। তার বড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার মৈশাদী ইউনিয়নে। তিনি চাঁদপুর জেলা বিএনপির উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের অন্যতম সদস্য। বর্তমানে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে বসবাস করছেন। তিনি সেখানে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

২০২৪ সালের মে মাসে তিনি চাঁদপুরে আসেন এবং নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি বেশ কয়েকদিন নির্বাচনি এলাকায় ঘুরে নিজের প্রার্থিতা জানান দেন। এর কিছুদিন পরেই অবার তিনি দেশ ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা চলে যান। এখনো তিনি প্রবাসেই রয়েছেন। তবে তার পক্ষে নেতাকর্মীরা নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা আজম খানের পক্ষে কাজ করছেন।

এ আসন থেকে বিএনপির অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন মোস্তফা খান সফরী। তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির নেতা। স্বৈরাচার এরশাদের সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বড় পদে থেকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। এরপর ২০০৮ সাল থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হতে চান। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে তিনি নির্বাচনি এলাকায় নেতকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করে যাচ্ছেন। তার প্রত্যাশা ভালো মানুষ হিসেবে নিশ্চয়ই দল তাকে মূল্যায়ন করবে। বিএনপির প্রার্থীরা ঈদুল আজহার আগে ও পরে এলাকায় গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। ভোটারদের মন জয় করার জন্য সবসময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, সারা দেশের ন্যায় এ আসনেও জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। চাঁদপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া প্রার্থিতা নিশ্চিত করে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। জামায়াতের এ প্রার্থী একসময় ছাত্রশিবির চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। পরবর্তিতে চাঁদপুর শহর জামায়াতের আমিরসহ নানা দায়িত্ব পালন করে এখন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন জামায়াতের এ প্রার্থী। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। জুলাই আগস্ট বিপ্লবের পর থেকে তিনি তার নির্বাচনি এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। অতীত বিজয়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এ আসনে দাঁড়িপাল্লার বিজয় সুনিশ্চিত করতে চান। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এই প্রার্থীর তীব্র লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চাঁদপুর-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থী শেখ মো. জয়নাল আবেদীন। তিনি দলের কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে দীর্ঘদিন চাঁদপুর জেলার সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পরিচয় একজন মানবিক মানুষ হিসেবে। করোনার ভয়াবহতার সময় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘরে ঘরে মানুষের সেবা দিয়েছেন। এখনো তিনি যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে সবার আগে গিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তার ধারণা এবারের নির্বাচনে তিনি ভালো ভোট পাবেন।

চাঁদপুরে-৩ আসনে গণফোরাম থেকে নির্বাচন করবেন এডভোকেট সেলিম আকবর। তিনি এর আগে ২৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার প্রত্যাশা এবার নির্বাচন যদি সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ হয়তবে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি ভোট পাবেন।

চাঁদপুর জেলা সদরের এই আসনটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ভিপি নূরের দল গণঅধিকার পরিষদের কোন প্রার্থীর উল্লেখযোগ্য কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

উল্লেখ্য, এ আসনে ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০০১ সালেও বিএনপির প্রার্থী লেফটেন্যান্ট (অব.) এস এ সুলতান টিটু বিজয়ী হয়েছিলেন।