আদনান মুরাদ
চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর ও হাইমচর) আসনকে ঘিরে নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণ ও অতীতের ভোটের পরিসংখ্যান ভেঙে নতুন বাস্তবতা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা এখন গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান, হাট-বাজার, সামাজিক আড্ডা সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াত সমর্থিত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী, সাবেক সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া। মেঘনার চরাঞ্চল থেকে জনবহুল শহরাঞ্চল প্রত্যেকটি পাড়া-মহল্লায় মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌছে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
এ আসনে অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বড় দুই ধারার রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। নিয়মিত গণসংযোগ, ঘরোয়া বৈঠক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে সক্রিয় উপস্থিতি এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গোছানোর মাধ্যমে জামায়াত তাদের অবস্থান দৃশ্যমান করেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, তারা শুধু ভোটের প্রচারণা নয়, বরং একটি “বিকল্প রাজনৈতিক ধারা” তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছেন।
শাহজাহান মিয়ার জন্য এ আসনের নির্বাচনী মাঠও বেশ পরিচিত। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি প্রতিকূল পরিবেশে আওয়ামি লীগ ও বিএনপি প্রার্থীকে হারিয়ে বিপুল ব্যবধানে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
চাঁদপুর পৌর জামায়াতের ওয়ার্ড সভাপতি বলেন, ধানের শীষের প্রার্থী অতীতে জাতীয় নির্বাচন করে এ আসন থেকে হেরেছেন। স্থানীয় নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করেছে। এবারও জনগন জামায়াত প্রার্থীকে ব্যাপক ভোটে বিজয়ী করবে।
সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও হাইমচরের চরাঞ্চল ঘুরে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, রাজনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি এবার ভোটাররা প্রার্থী ও প্রতীকের অতীত ভূমিকা, জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক অবস্থান, এসব বিষয়ও বিবেচনায় আনছেন। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে ঘিরে কৌতূহল ও আলোচনা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।
চাঁদপুর সদরের ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন বলেন, আগের নির্বাচনে যাদের ভোট দিয়েছেন, উন্নয়ন ও জনসেবার ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তাই এবারের ভোটে নতুন কাউকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন।
হাইমচরের তরুণ ভোটার আল মামুন জানান, তাদের প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। যে দল বা প্রার্থী এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে, সমর্থন তার দিকেই যাবে। তিনি আরো বলেন, জামায়াতের ইশতেহারে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
চাঁদপুর শহরের পুরাণ বাজারের চা বিক্রেতা বলেন, “ভাই, সকাল থেকে রাত,রাজনীতি ছাড়া কথা নাই। কে কী করবে, কার প্রতীক কী? সবাই হিসাব করে। জামাতের অনেক ভোটারও দোকানে আসে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের তৃণমূল ভোটারদের মনোভাবের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতেই জায়গা করে নিয়েছে। নির্বাচনী মাঠে তাদের দৃশ্যমানতা লক্ষ্যনীয়, যা ভোটের অংকে কতটা প্রভাব ফেলবে সেটিই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
সব মিলিয়ে চাঁদপুর-৩ আসনে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ ও ভোটারদের আগ্রহ। অতীতের গৎবাঁধা ফলাফলের ধারা বদলাবে, নাকি পুরনো শক্তির দাপটই বজায় থাকবে, এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ব্যালটের রায়ে। তবে এতটুকু স্পষ্ট, এবারের নির্বাচনে এই আসনটি নিছক আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে তা হয়ে উঠেছে কৌতূহলোদ্দীপক ও তাৎপর্যপূর্ণ এক লড়াইয়ের মঞ্চ।
chandpurdiganta.com The Daily Chandpur Diganta
