ঋণের তথ্য গোপন করেও বৈধতা পেল কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী

ঋণখেলাপি হওয়ায় উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। এই স্থগিতাদেশের কপি জমা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। অথচ নির্বাচনি হলফনামায় ঋণের তথ্য গোপন করে বলেছেন কোনো ঋণ নেই। এর পরও কোনো ধরনের প্রশ্ন ছাড়াই তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। সৌভাগ্যবান এই ব্যক্তি কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।

গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। এ নিয়ে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই আসনের এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ। এছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তার এরকম পক্ষপাতকে নির্বাচনের আগেই মঞ্জুর বিজয় হিসেবে বর্ণনা করছেন অনেকে।

নির্বাচন কমিশনে ওয়েবসাইটে থাকা হলফনামায় দেখা যাচ্ছে, ঋণসংক্রান্ত চারটি ঘর রয়েছে। একক, যৌথ, তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো ঋণ রয়েছে কি না। সব ঘরে তিনি উল্লেখ করেছেন–‘নাই’।

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এমএএম পাওয়ার লিমিটেডের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংক, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডে ঋণ রয়েছে। এসব ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।

তবে উচ্চ আদালত থেকে গত ৮ ডিসেম্বর এমএএম পাওয়ার লিমিটেড ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর নাম সিআইবি প্রতিবেদনে খেলাপি বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত, প্রচার ও প্রকাশের ওপর তিন মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেন। বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসানের একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

একই সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য একটি রুল জারি করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই স্থগিতাদেশের কপি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছে।

আদালতের আদেশে বলা হয়, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষরা এমএএম পাওয়ার লিমিটেড ও এর সংশ্লিষ্টদের নাম সিআইবি প্রতিবেদনে খেলাপি বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বা প্রকাশ করতে পারবে না। এ আদেশ তিন মাসের জন্য কার্যকর থাকবে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ঢাকা জেলার পঞ্চম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দায়ের করা মামলা নং ৬২০/২০২৫-এ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় ওই আদেশের বিরুদ্ধে এমএএম পাওয়ার লিমিটেড হাইকোর্টে আপিল করে। পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন এ আদেশ দেন।

আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ মামুন। মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সিআইবি, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিপক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আদালত আবেদনকারীদের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে প্রতিপক্ষদের কাছে প্রয়োজনীয় নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী বলেন, আমার নামে কোনো ঋণ নেই। যদিও তিনি স্বীকার করেন আমার কোম্পানির নামে ঋণ আছে। কোম্পানির ঋণের ঘরেও কেন ‘নাই’ উল্লেখ করেছেন জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, মঞ্জুর প্রতিষ্ঠানের যে খেলাপি ঋণ রয়েছে এবং স্থগিতাদেশ নিয়েছেন, সেই তথ্য আমরা নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছি। এখন তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।

এদিকে, একই আসন থেকে এসসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার আইনজীবী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ উত্থাপন করেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় আধাঘণ্টাব্যাপী বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্টদের আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ দাখিলের পরামর্শ দেন।

অভিযোগের বিষয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, কোম্পানি ঋণ ব্যক্তি থেকে আলাদা নয়। ঋণের সঙ্গে ওনার সম্পর্ক না থাকলে আদালত থেকে উনি খেলাপি হওয়ার কারণে স্থগিতাদেশ নেওয়ার প্রয়োজন হতো না। তিনি সেটা নিয়েছেন। হলফনামায় ঋণ তথ্য গোপন করার পরও কীভাবে ওনার প্রার্থীতা বৈধ হয় তা বোধগম্য নয়। আশা করি নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী বিষয়টি দেখবে।