রক্তরাঙা, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অমর একুশে ফেব্রুয়ারি কাল শুক্রবার। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৩ বছর পূর্ণ হবে এদিন। জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ভাষাশহীদদের স্মরণে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে।
সরকারিভাবে গৃহীত বিস্তারিত কর্মসূচি গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে একুশে প্রথম প্রহরে ১২টা ১ মিনিট থেকে শুরু হবে জাগরণী অনুষ্ঠান। এ সময় থেকে চাঁদপুর শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বেদীতে ভাষা শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ শুরু হয়ে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পৌর পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগ, বিএনপি, সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনার বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
আজ জাতীয় ছুটির দিন। এদিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। জেলার সকল মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা, ভাষা শহীদদের স্মরণে সকল স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা, বই পাঠ, স্বরচিত ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গত কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ইউনেস্কো দিবসটির একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারন করে দাফতরিকভাবেও সভা-সেমিনারের আয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিশেষ পোস্টার প্রকাশ ও বিবৃতি দিয়ে থাকে। ইউনেস্কো এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারন করেছে- ‘টোয়ার্ডস সাসটেইনেব্যল ফিউর্চাস থ্রু মাল্টিলিঙ্গুয়্যাল এডুকেশন’। ইউনেস্কো মনে করে, টেকসই উন্নয়নের জন্য বহুভাষিক শিক্ষার বিকল্প নেই। মাতৃভাষাকে প্রথম ভাষা রেখে অন্যান্য অপরিহার্য ভাষাগুলোকেও শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে।
‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?/ বরকতেরই রক্ত।/…..প্রভাতফেরি, প্রভাতফেরি/ আমায় নেবে সঙ্গে,/ বাংলা আমার বচন, আমি/ জন্মেছি এই বঙ্গে।’- একুশে উপলক্ষে সমকালীন বাংলা ভাষার প্রধান কবি আল মাহমুদের কবিতার মতোই আবেগপ্লাবন বয়ে যাচ্ছে প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয় অলিন্দে, ধমনীতে।
মাতৃভাষার জন্য জীবনদানের নজিরবিহীন আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল তারিখটি সত্যি সত্যিই অবিনাশী, অম্লান ও অক্ষয়। জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে দেশে দেশে এই দিনে স্মৃতির মিনারে রফিক-সালামদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন, প্রভাতফেরি, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তিন হাজার ছয়শ’ পনেরোটিসহ সারা দুনিয়ার সাত হাজারের বেশি জীবন্ত ভাষাকে মর্যাদা দানের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
বাঙালি জাতির জন্য এই দিবসটি হচ্ছে চরম শোক ও বেদনার, অনদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র-শিক্ষক ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ-রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানী শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলী চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলীবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
তাদের এই আত্মদান নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম তার ‘বায়ান্নরও আগে’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বরকত সালামকে আমরা ভালবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বরকত সালাম আমাদের ভালবাসে। ওরা আমাদের ভালবাসে বলেই ওদের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। ওরা আমাদের জীবনে অমৃতরসের স্পর্শ দিয়ে গেছে। সে রসে আমরা জনে জনে, প্রতিজনে এবং সমগ্রজনে সিক্ত।’
বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে তার এক লেখায় লিখেছেন, ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি- এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদরা প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোন আপোষ চলে না, চলে না কোনো গোঁজামিল । জীবন-মৃত্যুর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন।’
মোস্তফা কামালের ‘ভাষা আন্দোলন, সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ শীর্ষক গ্রন্থসহ ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ অনুযায়ী, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের ‘হোমরা-চোমরা’ ব্যক্তিদের ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ পুনঃপুনঃ এমন বক্তব্যের পর ওই সময় ছাত্র-শিক্ষকসহ সুধী সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। চাপা জনরোষ একসময় বাঁধভাঙ্গা আন্দোলনের রূপ নেয়। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর সংগঠিত ভাষা আন্দোলনে এক সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের অব্যবহিত পর থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে এ জনপদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষীরা ফুঁসে উঠতে থাকে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান হয়ে ওঠে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। পাকিস্তন কেন্দ্রীয় সরকার ভাষা আন্দোলনকে বানচাল করতে ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাইকযোগে প্রচার করে ‘আগামী একমাস ১৪৪ ধারা চলাকালে কোনো মিটিং-মিছিল করা চলবে না। এমনকি পাঁচজন একত্রে হাঁটাচলাও করতে পারবে না।’ ঐদিন রাতেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় ছাত্রসভা ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেন।
সে অনুযায়ী আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করা স্লোগানে অগ্রসরমান একটি মিছিল বিকাল ৪টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হোস্টেলের সামনে পৌঁছলে পুলিশ অতর্কিতে গুলীবর্ষণ করে। শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন রফিক, জব্বার-সালামরা। তাদের বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় পিচঢালা রাজপথ। বৃক্ষশাখের পলাশ-শিমুল হয়ে ওঠে আরো লাল। সেই থেকেই আমরা পেয়েছি ‘অ আ ক খ’ আপন করে।
মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠির প্রভুসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং ভাষার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ। ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন ‘মায়ের ভাষার’ মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নবপ্রেরণা। এরই পথ বেয়ে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পরবর্তী নয় মাস পাকিস্থানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে সংযোজিত হয় নতুন এক স্বাধীন সার্বভৌম দেশ- ‘বাংলাদেশ’।
আজ দুপুরের আগ পর্যন্ত দেশে এবং বিদেশে স্থায়ী ও অস্থায়ী শহীদ মিনারগুলো রফিক-সালামদের স্মরণে নিবেদিত ফুলে ভরে উঠবে। পূর্বাহ্নেই শহীদ মিনার ধোয়া-মোছা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ একুশের প্রভাতফেরি প্রদক্ষিণের এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, প্রণয়ন করা হয়েছে শহীদ মিনারে প্রবেশের রোডম্যাপ।
জাতীয় ছুটির দিন। এদিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। এ উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
গতকাল বিকেল চাঁদপুর জেলা শিশু একাডেমী ছবি আঁকা, সঙ্গীত, আবৃত্তি ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টায় চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়াম বইমেলা চত্তরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের উপর এবং ভাষা শহীদদের অমর স্মৃতির উদ্দেশ্যে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন। উপজেলা পর্যায়েও অমর একুশে স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া দিবসটির স্মরণে চাঁদপুর পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় শহরের নতুনবাজার মোড়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর, পৌর ভবন, শপথ চত্বর, ইলিশ চত্বর, চিত্রলেখার মোড়, সড়ক দ্বীপ ও বাস স্ট্যান্ডসহ অন্যান্য সড়ক বাংলা বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। চাঁদপুরের স্থানীয় পত্রিকাগুলো বিশেষ সংখ্যা বের করেছে।
