ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ছে : রোধে এখনি কার্যকর উদ্যোগ চাই

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগ এখন আর শুধু বর্ষাকালের মৌসুমি সমস্যা নয়; বছরের বড় একটি সময়জুড়েই এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বুধবার ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে। শুধু সেপ্টেম্বরেই এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১০৪ জন, যা এ বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ।

পরিস্থিতির আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পাঁচ হাজারেরও বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অর্থাৎ রোগীর চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের জন্য নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এক একটি মৃত্যু পরিবারের কান্না আর অসহায় হয়ে পড়া। এটি মশা নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতার একটি বড় সতর্কসংকেত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গু এখন রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবেও সীমাবদ্ধ নেই। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ছে। আমরা মনে করি এ জন্য প্রয়োজন সারাদেশে সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা যেকোনো স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এ মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু রাস্তা ও নালা-নর্দমায় ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোন এলাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং প্রজননস্থল বেশি— এসব তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। কোন খণ্ডিত কর্মসূচি জনসাধারণকে স্থায়ী সুরক্ষা দিতে পারে না। আমরা মনে করি অভিযানের ক্ষেত্রে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অভিযান পরিচালনার দাবি নয়, তার ফলাফলও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স এবং জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীর ব্যবস্থা থাকতে হবে। জনসচেতনতাও ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তবে নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

গত বছরও দেশে ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় ১ লাখ ২ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এর আগে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু এবং ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা মনে করি ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন দরকার বছরব্যাপী পরিকল্পনা— শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়লে অভিযান চালানো নয়।

ডেঙ্গুতে ২০১ জনের মৃত্যু আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। আরও মৃত্যুর অপেক্ষা না করে ডেঙ্গুতে প্রাণহানি রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ ডেঙ্গু শুধু একটি রোগ নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক দায়িত্বের সম্মিলিত পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতার মূল্য যেন আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জন হারিয়ে দিতে না হয়— এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন

সম্পর্কিত খবর