মঙ্গলবার , মে ২১ ২০২৪

জিলহজ মাসের প্রথম দশকের ফজিলত

মাওলানা এসএম আনওয়ারুল করীম

পৃথিবীর আদিকাল হতেই আল্লাহর গণনায় মাস বারোটি। মহানবি (স) তন্মধ্যে চারটি মাসকে সম্মানিত আখ্যায়িত করেছেন। এ মাসসমূহে যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত হারাম। তন্মধ্যে জিলহজ মাস অন্যতম। হাদিসের বর্ণনায় এ মাসের প্রথম দশ দিনের রয়েছে বিশেষ আমল ও ফজিলত।

জিলহজ মাসের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সুরা আল ফাজরে ইরশাদ করেছেন, ‘শপথ প্রভাতকালের! শপথ ১০ রাতের!’ তাফসিরে ইবনে কাসিরেও এ ১০ রাতের শপথ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১০ রাতের শপথ দ্বারা জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনই উদ্দেশ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা যেন নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর স্মরণ করে।’ (সুরা হজ : আয়াত ২৮) প্রখ্যাত মুফাসসির সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, ‘এ নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন।’

হাদিসের দৃষ্টিতে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমলের ফজিলত জিহাদের চেয়েও মর্যাদাবান। হজরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, এ দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম ১০ দিনের) আমলের তুলনায় কোনো আমলই অন্য কোনো সময় উত্তম নয়। তারা বলল, জেহাদও নয়? তিনি বললেন, জিহাদও নয়; তবে যে ব্যক্তি নিজের জানের শঙ্কা ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে, অতঃপর কিছু নিয়েই ফিরে আসেনি।’ (বুখারি ৯৬৯, তিরমিজি ৭৫৭)

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের একেক দিনের রোজা রাখা এক বছর রোজা রাখার সমতুল্য এবং একেক রাতের ইবাদত কদরের রাতে ইবাদতের সমতুল্য (তিরমিজি ৭৫৮) অন্য এক হাদিসে নবি করিম (স) বলেছেন, আরাফার দিন রোজা রাখলে আল্লাহ তায়ালা পূর্বের ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। (সহিহ মুসলিম ১৯৬)
জিলহজ মাস মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ দুটি।

প্রথমত এ মাসেই হজ তথা ইয়াওমে আরাফা অনুষ্ঠিত হয়।

হাদিসে আরাফার ময়দানে উপস্থিত হওয়াকেই হজ বলা হয়েছে। তাছাড়া কেউ যদি ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) সন্ধ্যার আগে মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফার ময়দানে উপস্থিত না হয় তবে তার হজ হবে না। পরবর্তী বছর আবার তাকে হজ আদায় করতে হবে। দ্বিতীয়ত কোরবানি। যা ইসলামের অন্যতম নির্দশন ও সুন্নাত। ফজিলতপূর্ণ এ দুটি কাজ মর্যাদাপূর্ণ মাস রমজানেও আদায় করা সম্ভব নয়।

সহিহ বুখারি, মুসলিম ও নাসায়ীর ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা থেকে প্রমাণিত যে, জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন কোরবানি করার আগ পর্যন্ত রোজা পালনসহ যে কোনো নেকির কাজ অধিক সাওয়াব ও ফজিলতপূর্ণ। সে হিসাব ১ থেকে ৯ জিলহজ পর্যন্ত রোজা রাখা যায়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজেও এ দিনগুলোতে রোজা রাখতেন।

জিলহজ মাসের পাঁচ দিন তাকবিরে তাশরিক আদায় করা ওয়াজিব। তাকবিরে তাশরিক হলোÑ ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ (কিতাবুল আছার আবু ইউসুফ র. বর্ণনা নং ২৯৭) তাকবিরে তাশরিক পুরুষরা উচ্চৈঃস্বরে আর মহিলারা নিচু স্বরে পড়বে। অর্থাৎ মহিলাদের তাকবিরের শব্দ যেন (গায়রে মাহরাম) অন্য লোকে না শোনে।

এ মাসের নবম দিন ও রাত আল্লাহর নিকট অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

দিনটি হলো আরাফাতের ময়দানে সমবেত হওয়ার দিন। আর রাতটি হলো মুজদালিফায় (শবে কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ) অবস্থানের রাত।

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘আমার প্রতি আজহার দিন (১০ জিলহজ) ঈদ পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আল্লাহ এই উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! যদি আমার কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য না থাকে কিন্তু আমার কাছে এমন উট বা বকরি থাকে, যার দুধ পান করা বা মাল বহন করার জন্য তা প্রতিপালন করি। আমি কি তা কোরবানি করতে পারি? তিনি বললেন, না; বরং তুমি তোমার মাথার চুল, নখ, গোঁফ কেটে ফেল এবং নাভির নিচের চুল পরিষ্কার করো। এ আমলই আল্লাহর নিকট তোমার কোরবানি। (সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং ৪৩৬৫; শরহু মায়ানিয়িল আছার তাহাবি, খÐ ২, পৃষ্ঠা ৩০৫)।

জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত দিনে রোজা পালন করা, রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা উচিত। যথাÑ নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ, তওবা-ইসতিগফার ইত্যাদি। সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, জিলহজের ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অন্য দিনের ইবাদতের তুলনায় বেশি প্রিয়। প্রতিটি দিনের রোজা এক বছরের রোজার মতো আর প্রতি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের মতো’ (তিরমিজি, ৭৫৮)।

আরাফার দিন, অর্থাৎ ৯ জিলহজ নফল রোজা রাখা বিশেষ সুন্নত আমল।

তবে আরাফায় উপস্থিত হাজি সাহেবদের জন্য এই রোজা প্রযোজ্য নয়। হজরত আবু কাতাদা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী যে আল্লাহ তায়ালা তার (রোজাদারের) বিগত এক বঝরের ও সামনের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি, খÐ ১, পৃষ্ঠা ১৫৭)।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর একবার তাকবির বলা ওয়াজিব (ইলাউস সুনান, খÐ ৮, পৃষ্ঠা ১৪৮)।
জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ যেকোনো দিন, কোনো ব্যক্তির মালিকানায় নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা এর সমমূল্যের সম্পদ থাকলে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। পুরুষ ও নারী সবার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য (ইবনে মাজাহ ২২৬)।

হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (র) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স)-এর কাছে সাহাবিগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ কোরবানি কী?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ)-এর সুন্নাত।’ তাঁরা পুনরায় বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তাতে আমাদের জন্য কী সাওয়াব রয়েছে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি সাওয়াব রয়েছে।’ তাঁরা আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! ভেড়ার লোমের কী হুকুম? (এটা তো গণনা করা সম্ভব নয়)।’ তিনি বললেন, ‘ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি সাওয়াব রয়েছে’ (ইবনে মাজাহ ২২৬)।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের নির্ধারিত আমলগুলো পালনের মাধ্যম হাদিসে ঘোষিত ফজিলত ও মর্যাদা লাভ করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : মাওলানা এসএম আনওয়ারুল করীম
মুহাদ্দিস, ইসলামি চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক; খতিব, হাজি শরিয়ত উল্লাহ (র) জামে মসজিদ, চাঁদপুর।