মঙ্গলবার , জুন ২৫ ২০২৪

ইলিশ নিয়ে যত গবেষণা ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর

রেজাউল করিম

পদ্মা-মেঘনার সুস্বাদু রুপালি ইলিশের জন্য খ্যাত চাঁদপুরকে এখন বলা হয় ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’। এই চাঁদপুরেই বছরের পর বছর ইলিশের বংশ, প্রজাতি, প্রজনন, বিচরণ, মজুতসহ তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে নানা ধরনের গবেষণা।

প্রায় ৩৩ বছরের গবেষণার সফলতায় দেশে ইলিশের উৎপাদনও বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। জাতীয় মাছ ইলিশ সম্পদকে আরও সমৃদ্ধ করতে সরকারও নানা পদক্ষেপ নিয়ে তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদীকেন্দ্র চাঁদপুরে খোঁজ নিয়ে গবেষণার এমনই তথ্য পাওয়া যায়।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদীকেন্দ্র চাঁদপুরের তথ্যমতে, ১৯৮৬-৮৭ সালে শুরু হয় দেশে ইলিশ নিয়ে প্রথম গবেষণা। সে সময় ইলিশের পরিচয়, তার প্রজাতি, বসবাস ও চলাচল নিয়ে গবেষণা শুরু হয়।

১৯৮৮ সালে ইলিশের প্রজনন নিয়ে কাজ শুরু করেন তৎকালীন বিজ্ঞানী ও বর্তমান মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদীকেন্দ্র চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমানসহ চারজন। বর্তমানে ১৪ জন বিজ্ঞানী ইলিশ নিয়ে দুই ধরনের গবেষণার কর্মপদ্ধতি চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে প্রথমটি ইলিশের মজুত নিরূপণ ও দ্বিতীয়টি ইলিশের প্রজনন বা বংশবিস্তার নিয়ে।

ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে ইলিশ নিয়ে সাগরে ও নদ-নদীতে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে আসছি।

এ জন্য অধিকাংশ সময় আমাদের সাগর বা নদীতে থাকতে হয়। পাশাপাশি মৎস্য অধিদপ্তর ও ইনস্টিটিউটেও এই ইলিশ নিয়ে সারা বছরই নানা ধরনের কাজ চলছে। আমাদের এই গবেষণায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছেন। আজ আমাদের গবেষণার ফলে সরকারও ইলিশ রক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

ড. আনিস জানান, ২০০০ সাল পর্যন্ত গবেষণায় প্রচলিত চলমান পদ্ধতির কারণে ইলিশ তেমন একটা বাড়েনি। তখন সারা বছর ইলিশের উৎপাদন ছিল এক থেকে দেড় লাখ টন। তবে ২০০৩-০৪ সালে উন্নত ইলিশ ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রহণ করে জাটকা সংরক্ষণ পদ্ধতির ওপর কাজ হলে আস্তে আস্তে ইলিশ উৎপাদনও বাড়তে থাকে।

পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে নদী ও সাগরে জাটকা সংরক্ষণের পাশাপাশি মা ইলিশ রক্ষায় অভয়াশ্রম ঘোষণা ও প্রজনন সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ইলিশ উৎপাদন আরও বাড়তে থাকে।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, ইলিশের তিনটি প্রজাতি রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে পদ্মার রুপালি ইলিশ, যেটি আকারে বড় এবং স্বাদে–গন্ধেও অতুলনীয়। যার কারণে এর চাহিদা দেশ–বিদেশে বেশি। অন্য দুটি জাতের মধ্যে একটি চন্দনা ইলিশ, অন্যটি গুর্তা ইলিশ। এগুলো আকারে ছোট এবং স্বাদও কম। এদের অবস্থান সাগরেই বেশি। যদিও বর্তমান বাজারে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী এসব ইলিশ পদ্মার ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে বেচাকেনা করছেন।

কখন কোথায় থাকে, কীভাবে বাড়ে ইলিশ

ইলিশ বেশির ভাগ সময় সাগরে থাকে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আস্তে আস্তে সাগরের লোনা পানি থেকে উঠে এসে নদীর মিষ্টি পানিতে প্রবেশ করতে থাকে। মিষ্টি পানির গভীরে থাকা প্লাংটন খায়। জানা যায়, এর ফলে ইলিশের স্বাদ বাড়ে। মা ইলিশ মিষ্টি পানিতে তাদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ডিম ছাড়ার পর আবার সাগরে ফিরে যায়।

সহজে বা নিরাপদে ডিম ছাড়ার জন্য প্রতিবছর ২২ দিন (বর্তমানে ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর) নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।এসব ডিম থেকে পোনা জন্ম নেওয়ার পর নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাস ইলিশ মিষ্টি পানির নদীতে অবস্থান করে। জুন মাসের দিকে এসব ইলিশের পোনা জাটকায় রূপ নেয়।

এ জন্য মার্চ-এপ্রিল এ দুই মাস আবার বড় হওয়ার জন্য নদীতে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। জুনের পর থেকে তারা দলে দলে আবার সাগরে ফিরতে থাকে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদীকেন্দ্র চাঁদপুরের ইলিশ গবেষক দল ইলিশ গবেষণা ভেসেল এমভি রুপালি ইলিশ প্রজনন অঞ্চলসহ ইলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব অঞ্চলে (প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার নদী এলাকা, মৌলভীরচর, মনপুরা, ঢলচর ও কালিরচরসহ) বিভিন্ন ইলিশ অবতরণ এলাকায় ইলিশের নানা তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।

ইলিশ ধ্বংসের কারণ

ইলিশ ধ্বংসের মূল কারণ কারেন্ট জাল, প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সময় ইলিশ ধরা। তবে সেই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে সারা বছর নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা, নদীদূষণ, নাব্যতা ঠিক না রাখাসহ নানা কারণে ইলিশ ধ্বংস হচ্ছে বলেও গবেষকেরা জানিয়েছেন।

এ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন মহলকে সংযুক্ত করে আগামী দিনে ইলিশের সুরক্ষা ও উৎপাদনের আরও কর্মসূচি গ্রহণ করারও পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ভাবছেন গবেষকেরা। এরই মধ্যে নেওয়া ইলিশ রক্ষা প্রচেষ্টায় শুধু ইলিশই নয়, বরং দেশের নদ–নদী ও সাগরে অন্যান্য মাছও রক্ষা পাচ্ছে। দেশের মৎস্য সম্পদও ব্যাপক বাড়ছে।

ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কৌশলের সাফল্য

ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন (২২ দিন, ৯-৩০ অক্টোবর ২০১৯) সময়ে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার ফলে ইলিশের প্রজনন সফলতা নিরূপণের জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদীকেন্দ্র চাঁদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা শেষ করেছে।

রীক্ষামূলক জাল-যন্ত্রপাতিসহ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালীন ২২ দিন এবং তার আগের ১০ দিন ও পরের ১০ দিনে প্রজনন অঞ্চলসহ ইলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে।

এ সময় প্রজননে পরিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণকারী ইলিশ, তথা স্পেন্ট ইলিশ (স্থানীয় ভাষায় পাইট বলে), আংশিক স্পেন্ট ও উজিং বা ডিম ছাড়ারত ইলিশের তথ্য সংগ্রহ করে গবেষক দল। সে তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০১৯ সালের প্রজনন সফলতার হার পাওয়া গেছে ৪৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ, ৪৮ দশমিক ৯২ শতাংশ ইলিশ সফলভাবে প্রজননক্রিয়ায় অংশ নিতে পেরেছে

এবং যা ২০০১-০২ সালের থেকে ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। হিসাবমতে, এ বছর মোট নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ ৭ লাখ ৪০ হাজার ৯৬৮ কেজি এবং সমগ্র নিষিক্ত ডিমের ৫০ ভাগ হ্যাচ করলে এবং তার ১০ ভাগ বাঁচার হার ধরলে এ বছর প্রায় ৩৭ হাজার কোটি ইলিশ পোনা (জাটকা) ‘ইলিশ’ হয়ে ওঠার কথা।

প্রায় ৩৩ বছরের গবেষণার সফলতায় দেশে ইলিশের উৎপাদনও বেড়েছে প্রায় তিন গুণ

সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার কারণে প্রজনন অঞ্চলে স্ত্রী ইলিশের শতকরা হার ৭৭-৮২ ভাগ বেড়ে যেতে দেখা যায়। ইলিশ প্রজনন অঞ্চলে প্রথম সপ্তাহে স্পেন্ট ইলিশের হার গড়ে ৪ ভাগ থাকলেও শেষ সপ্তাহসহ সামগ্রিক হিসাব মিলিয়ে এ বছর স্পেন্ট ইলিশের হার গড়ে প্রায় ৪৮ দশমিক ৯২ শতাংশ হওয়ার কথা।

প্রতিবছর কিছু করে হলেও বাড়ছে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ। ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ও গবেষণা কর্মে নেতৃত্বে রয়েছে চাঁদপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। গবেষণা এবং তার বাস্তবায়ন ছাড়াও সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টা জাড়ি রয়েছে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে। অদূর ভবিষ্যতে এর ফলাফল দেখা যাবে।