মঙ্গলবার , মে ২১ ২০২৪

আজ মহান অমর একুশে

ইলিয়াছ পাটওয়ারী

বিশ^ময় গর্বের স্মারক অমর একুশে ফেব্রæয়ারি আজ রবিবার। জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতির প্রথম প্রতিরোধ ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই। ১৯৫২ সালে জাতীয় জীবনের অনন্যোজ্জ্বল এ দিনটি এবার ৬৯তম মহান শহীদ দিবস ও ২২তম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ^ব্যাপীর অংশ হিসেবে বর্ণাঢ্য আয়োজনে চাঁদপুুর পালন করা হবে।

সমকালীন বাংলা ভাষার প্রধান কবি আল মাহমুদ কবিতায় “ফেব্রæয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?/বরকতের রক্ত।/…… প্রভাতফেরি, প্রভাতফেরি/ আমায় নেবে সঙ্গে,/ বাংলা আমার বচন, আমি/ জন্মেছি এই বঙ্গে।” আবেগ প্রাবণ বয়ে যাচ্ছে প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয় অলিন্দে, ধমনীতে।

কারন, বিশ^ময় গর্বের স্মারক অমর একুশে ফেব্রæয়ারি। এ দিনে যারা মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছিলেন সেই বীর ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণের দিন। জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশসহ বিশে^র ১৯৩টি দেশে স্মৃতির মিনারে রফিক-সালামদের স্মরণে শ্রদ্ধায় পালিত হচ্ছে এ দিবস। আমাদের দেশে পলাশ আর শিমুল ফোটা ফাল্গুনের একটু একটু শীতমাখা রাতে খালি পায়ে শহীদমিনার অভিমুখে উচ্চারিত হচ্ছে সেই চির গৌরবের অবিনাশী সুর,‘আমার ভাইয়ের রক্তের রাঙ্গানো একুশে ফেব্রæয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’

চাঁদপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ

এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ একুশের প্রথম প্রহরে ১২টা ১ মিনিটে সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটি পালনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যে কোনো জাতির জন্য সবচেয়ে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার হচ্ছে মৃত্যুর উত্তরাধিকার- মরতে জানা ও মরতে পারার উত্তরাধিকার। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি শহীদরা জাতিকে সে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন।

১৯৫২ সালের এদিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠির চোখ-রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানী শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

তাদের এই আত্মদান নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম তার ‘বায়ান্নর আগে’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘বরকত-সালামকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বরকত-সালাম আমাদের ভালোবাসে। ওরা আমাদের ভালোবাসে বলেই ওদের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। ওরা আমাদের জীবনে অমৃতরসের স্পর্শ দিয়ে গেছে।

সে রসে আমরা জনে জনে, প্রতিজনে এবং সমগ্রজনে সিক্ত।’

এদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে আমরা অমরতা পেয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা বলতে পারি দস্যুকে, বর্বরকে এবং দাম্ভিককে : তোমরা আর আমাদের মারতে পারবে না। কেননা, বরকত-সালাম রক্তের সমুদ্র মন্থন করে আমাদের জীবনে অমরতার স্পর্শ দিয়ে গেছেন।’

বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে লিখেছেন ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি- এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রæয়ারির শহীদরা প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোন আপস চলেনা, চলেনা কোন গোঁজামিল। জীবন-মৃত্যুর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ‘৫২-এর একুশে ফেব্রæয়ারি ছিলো ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠির প্রভূসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং ভাষার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ।

মোস্তফা কামালের ‘ভাষা আন্দোলন, সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ শীর্ষক গ্রন্থসহ ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ অনুযায়ী, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ হোমরা-চোমরা’ ব্যক্তিদের ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ পুনঃপুনঃ এমন বক্তব্যের পর ওই সময় ছাত্র-শিক্ষকসহ সুধী সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। চাপা জনরোষ একসময় বাঁধভাঙ্গা আন্দোলনের রূপ নেয়।

ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর সংগঠিত ভাষা আন্দোলনে এক সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের অব্যবহিত পর থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে এ জনপদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষীরা ফুঁসে উঠতে থাকে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ওঠে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।

পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার ভাষা আন্দোলনকে বানচাল করতে ২০ ফেব্রæয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাইকযোগে প্রচার করে ‘আগামী একমাস ১৪৪ ধারা চলাকালে কোনো মিটিং-মিছিল করা চলবে না। এমনকি পাঁচজন একত্রে হাঁটাচলাও করতে পারবে না।’ ঐদিন রাতেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ একুশে ফেব্রæয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় ছাত্রসভা ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সে অনুযায়ী আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করা শ্লোগানে অগ্রসরমান

একটি মিছিল বিকাল ৪টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হোস্টেলের সামনে পৌঁছলে পুলিশ অতর্কিতে গুলীবর্ষণ করে। শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন রফিক, জব্বার-সালামরা। তাদের বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় পিচঢালা রাজপথ। বৃক্ষশাখের পলাশ-শিমুল হয়ে ওঠে আরো লাল। সেই থেকেই আমরা পেয়েছি ‘অ আ ক খ’ আপন করে।

ঊস্তুুত, মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ‘৫২-এর একুশে ফেব্রæয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠির প্রভূসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং ভাষার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ। ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন ‘মায়ের ভাষার’ মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নব প্রেরণা। একুশে ফেব্র“য়ারি শোকাবহ হলেও এর যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় তা পৃথিবীর বুকে অনন্য। কারণ বিশ্বে এ যাবতকালে একমাত্র বাঙালি জাতিই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে।

২১ ফেব্রæয়ারি জাতীয় ছুটির দিন। এদিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। ২১ ফেব্র“য়ারি উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।