শনিবার , জুলাই ২০ ২০২৪

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় নেতাদের মুখে কেন ‌’যুদ্ধের ভাষা?’

কোভিড-১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের নেতাদের অনেকের মুখেই অন্তত: এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে – এমন ভাষা শোনা যাচ্ছে, যা সাধারণত যুদ্ধের সময় শোনা যায়।

কিন্তু অতীতের নানা যুদ্ধ থেকে কি করোনাভাইরাস মোকাবিলার এই প্রয়াসে শেখার কিছু আছে?

বিবিসির এ্যাড্রিয়েন বার্নহার্ড লিখছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার মধ্যেই ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল পার্লমেন্টে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‍“আমাদের সাম্রাজ্য এবং ইংরেজিভাষী বিশ্ব এখন এক অন্ধকার মৃত্যু-উপত্যকার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি যদি এর প্রকৃত রূপ তুলে না ধরি তাহলে সেটা আমার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার শামিল হবে।“

এখন এই করোনাভাইরাস মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপমা দেয়া হচ্ছে ব্যাপকভাবে।

নিউইয়র্কের গভর্নর এ্যান্ডরু কুয়োমোকে অনেকেই তুলনা করেছে একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্টের সাথে। তিনি তার সংবাদ সম্মেলনেও কথা বলছেন যুদ্ধের ভাষায়। সংক্রমণের চূড়ার কথা বলতে গিয়ে বরছে, “এবার যুদ্ধ হবে পর্বতের চূড়ায়।“

আরেকদিন মি. কুয়োমো বলেন, ‍“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমার ভুমিকা যা ছিল, ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভেন্টিলেটর হচ্ছে ঠিক তাই।“

অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ইউরোপের নেতারাও এমন ভাষাতে কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ‍“এক অদৃশ্য শত্রর বিরুদ্ধে যুদ্ধের” কথা।

—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক ট্রাক্টর কারখানায় বানানো হয়েছে ট্যাংক

কেউ বলেছেন, এই ভাইরাস সংক্রমণ একদিন অনিবার্যভাবেই এত ছড়িয়ে পড়বে যে হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না – ঠিক যেমন হয়েছিল ডি-ডের দিন (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের উপকুলে মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্যের প্রথম অবতরণের দিন)।

স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা এখন হচ্ছেন ‘ফ্রন্টলাইনের কর্মী’, বিজ্ঞানীরা হচ্ছেন নতুন ‘‍জেনারেল’, অর্থনীতিবিদরা তৈরি করছেন “যুদ্ধ পরিকল্পনা”, রাজনীতিবিদরা বলছেন, ‍“মোবিলাইজেশনে”র কথা।

কয়েক সপ্তাহ আগে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রিটেনের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মতোই শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তা দেখান।

অবশ্যই এটা বলতেই হবে যে আসল যুদ্ধের সাথে এই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ‌‘যুদ্ধের’ অনেক পার্থক্য।

কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ সরকারগুলোকে নিতে হচ্ছে যা অনেকটা যুদ্ধের মতোই। নানা জিনিসের উৎপাদন বাড়ানো, এক খাত থেকে সম্পদ নিয়ে অন্য খাতে দেয়া, সরকারি নজরদারি, প্রণোদনা, সম্ভাব্য রেশনিং – এগুলোর মধ্যে অনেকটা যুদ্ধকালীন সময়ের ভাব আছে।

এ থেকে কি ভবিষ্যতের জন্য শেখার কিছু আছে?

অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপি লড়াই

করোনাভাইরাস মহামারিকে বুঝতে এরকম যুদ্ধের মানসিকতা কতটা প্রাসঙ্গিক – তা স্পষ্ট নয়।

যখন রাজনীতিবিদ বা সাংবাদিকরা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাথে যুদ্ধের তুলনা করেন – তাদের কিছু অনুমান কিন্তু বিপজ্জনক এমনকি ক্ষতিকরও হতে পারে।

নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মার্ক আর উইলসন বলছেন, “আমরা যদি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ শুরু করে দেই, তাতে কিন্তু একটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা বিশ্ববাণিজ্যের কোন মৌলিক সমস্যার হচ্ছে না।“

করোনাভাইরাসের “যুদ্ধকালীন অর্থনীতি”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রচুর পরিমাণে জাহাজ, ট্যাংক ও বোমারু বিমান তৈরির জন্য একটা “যুদ্ধকালীন অর্থনীতি” তৈরি হয়েছিল। যুক্তরাজ্য ও ব্রিটেনে গাড়ি নির্মাতারা সেনাবাহিনীর ট্রাক তৈরি করছিল, ঘড়ি নির্মাতা ও অন্য শিল্প কারখানায় তৈরি হচ্ছিল কামান ও বন্দুকের গোলাবারুদ, সিল্কের মোজার পরিবর্তে কারখানায় তৈরি হচ্ছিল প্যারাশুট।

করোনাভাইরাস মোকাবিলার ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হয়েছে।

মাত্র ৭২ ঘন্টার নোটিশে বিলাসবহুল পারফিউমে ব্যবহারের জন্য তৈরি এ্যালকোহল দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানাতে শুরু করেছিল লাক্সারি ব্র্যান্ড লুই ভিতোঁ – যা পাঠানো হয়েছিল সারা ফ্রান্সের হাসপাতালে।

আমেরিকান গাড়ি-নির্মাতা জেনারেল মোটর্স -যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্যাংক তৈরি করেছিল – তারা করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাজার হাজার ভেন্টিলেটর তৈরি করছে।

যুক্তরাজ্যের কিছু পোশাক নির্মাতা এখন এন-৯৫ জাতীয় সার্জিক্যাল মাস্ক তৈরি করছে।

সারা দুনিয়ার বিমান সংস্থাগুলো এখন চার্টার্ড ফ্লাইট চালাচ্ছে, স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কাজে, বা বিভিন্ন দেশে আটকেপড়া মানুষদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে।

অনেক জাহাজ ব্যবহৃত হচ্ছে কোভিড-১৯ রোগীদের হাসপাতাল হিসেবে।

মানব সম্পদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। হাসপাতালের জরুরি সেবায় বা ইনটেনসিভ কেয়ারে কাজ করছেন নিউরোসার্জন, বা কার্ডিওলজিস্টরা, এমনকি মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীরা। করোনাভাইরাস রোগীদের স্ক্রিনিং করছেন রিসেপশনিস্টরা।

রেস্তোরাঁকর্মীরা এখন স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য খাবার তৈরি করছেন, পৌঁছে দিচ্ছেন, বাবা-মায়েরা হয়ে গেছেন বাচ্চাদের শিক্ষক, হোটেলগুলো দরজা খুলে দিয়েছে স্বাস্থ্য কর্মীদের আর তাদের ম্যানেজারদের শিখতে হয়েছে হাসপাতালের প্রটোকল।

হয়তো এসব জরুরি পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সম্পদ সন্নিবেশের পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগতে পারে।

আগামী কয়েক মাসে হয়তো অনেক কারখানা এমন উৎপাদনব্যবস্থা স্থাপন করবে – যাতে টিকা উৎপাদন এবং এ্যান্টিবডি টেস্টের প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়ে যাবে।

সামাজিক দূরত্ব রক্ষার নিয়মকানুন মেনে চলার ক্ষেত্রে মানুষ যেভাবে নানা অসুবিধা মেনে নিয়েছে – সেটাও যুদ্ধের সময় মানুষের ব্যক্তিগত ত্যাগের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।

এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক মেরি এল ডুজিয়াক বলছেন, ‍“লোকে যুদ্ধের প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করছে ঠিকই – কিন্তু মহামারি সে অর্থে যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের সময় একটি দেশ প্রতিপক্ষকে হত্যা করে কিন্তু মহামারি মোকাবিলার সময় মানুষ জীবন রক্ষার চেষ্টা করে।“

সংস্কারের সুযোগ

বিভিন্ন সংকট প্রায়ই সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে, বলছিলেন অধ্যাপক উইলসন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে নানা দেশে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংস্কার হয়েছে, জাতিসংঘ বা আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্ম হয়েছে, যুদ্ধফেরত সৈন্যদের জন্য নানা কল্যাণভাতা চালু হয়েছে।

হয়তো করোনাভাইরাস সংকটও সমাজে কিছু সংস্কার নিয়ে আসতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ ও এশিয়ার বিপুল অংশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল, মৃত্যু হয়েছিল ছয় কোটি লোকের। সরকারগুলোকে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুদ্ধার করতে বহু পরিকল্পনা নিতে হয়েছিল।

সে সময় যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে তৈরি হয়েছিল নতুন শিল্প, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা, বহু পুরোনো ধারণা পরিত্যক্ত হয়ে পুঁজি, শিল্পোদ্যোগ, বা সামাজিক বন্ধন সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণার জন্ম হয়েছিল। এসবের ফলে সম্ভব হয়েছিল যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা।

হয়তো করোনাভাইরাস মহামারির পর আর কখনো ‌‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা’‌ হবে না। একটা কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে কোন কিছুই ‘নিশ্চিত’ থাকবে না।

তবে এটা ঠিক যে এই করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক স্তরে এমনভাবে নানা পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করেছে – যা গত ৮০ বছরে দেখা যায় নি।

হয়তো সেই একতা আগামী বছরগুলোতেও টিকে থাকবে।